শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০ ইং, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৫ জিলহজ্জ ১৪৪১ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » ‘জিয়ার মুখে রবের স্বাধীনতার ঘোষণা শোনা’

‘জিয়ার মুখে রবের স্বাধীনতার ঘোষণা শোনা’

মোঃ আসাদ উল্লাহ তুষার:

নৈতিক অধঃপতন বা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব হয়ে গেলে যা হয় তাইই হয়েছে জাতীয় ঐক্যাফ্রন্ট নেতা ও জেএসডি সভাপতি অসম আব্দুর রবের । দেউলিয়াত্ব চরম পর্যায়ে না পৌঁছালে নিজের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাসকেও মাটি চাপা দিয়ে কোন সামরিক স্বৈরাচারের মোসাহেবি কেউ করে। তাই করেছেন রব। আসম আব্দুর রব ষাটের দশকের ডাকসাইটে ছাত্রনেতা। নোয়াখালী জেলা ছাত্রলীগের রাজনীতি দিয়ে রাজনীতির জীবনের হাতে খড়ি । ছিলেন বৃহত্তর নোয়াখালী জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক । পরবর্তীতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে জড়িত হয়ে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন । অবিভক্ত ছাত্রলীগে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদের সাথে ছিলেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্নেহ করতেন । বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত ষাটের দশকের প্রায় পুরো সময়টাই ছাত্রলীগের যে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা তার সম্মুখভাগে থেকে লড়াই করেছেন আসম আব্দুর রব। ১৯৭১ সালের দোসরা মার্চ পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডাকসুর ভিপি হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলন করে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছিল। লড়াই-সংগ্রাম হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে তার নেতৃত্বে । লাখো লাখো যুবক ও ছাত্র কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করে শহীদ হয়েছেন,দেশকে স্বাধীন করেছেন। ইতিহাসে তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে তারা ইতিহাসের একেকজন নায়কে পরিণত হয়েছিলেন। যে ইতিহাসের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে স্বাধীন বাংলাদেশে পদার্পণ করেন । তার কিছুদিন পর থেকেই অতি বিপ্লবী, বিপ্লবের নামে যারা দেশ বিরোধী কর্মকান্ড করার ষড়যন্ত্র আটছে, হাজার হাজার ছাত্ৰ যুবককে যারা বিপথগামী করেছে, তাদের অতি বিপ্লবী কর্মকান্ড , অনেকেই বলে অতিলোভী কর্মকাণ্ডের কারণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তা এবং কর্মের সাথে সুক্ষভাবে বিরোধিতা করতে করতে এক পর্যায়ে কিছু পাওনা না পাওয়ার অভিমানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে এবং যার নেতৃত্ব দেয় আসম আব্দুর রব। ষাটের দশকের মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিকতায় এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন দেশের যে লড়াই-সংগ্রাম তাকে পুঁজি করেই তৎকালীন ছাত্রলীগের একটি বিরাট অংশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের তীব্র বিরোধিতা করতে এবং আন্তর্জাতিক চক্রান্তে এই জাসদের জন্ম হয় । জাসদের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম প্রধান নেতা আসম আব্দুর রব ।

স্বাধীনতার পর থেকে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর শাহাদত হওয়ার দিন পর্যন্ত জাসদের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড দেশবাসী জানে। আজকে সেই বিষয়ে আলোচনা এখানে আনছি না। আজকের আলোচনার বিষয় মুক্তিযুদ্ধের বীর সংগঠক আসম আব্দুর রব তার মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার বিষয়ে । মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্যেশ্যে কেরানীগঞ্জ গিয়ে তিনি জিয়ার ‘স্বাধীনতা’র ঘোষণা শোনেন। কয় তারিখে তা অবশ্য উল্লেখ করেন নাই। জিয়ার ঘোষণা শুনেই তিনি যুদ্ধে গেছেন কিনা সেসম্পর্কেও অবশ্য কিছু বলেননি। তাহলে তিনি কেন দোসরা মার্চ বাংলাদেশের পতাকা তুললেন আর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তাহলে কিসের ডাক দিলেন।আর তিনিই বা কার ডাকে কিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে কেরানীগঞ্জ গেলেন? নিজের অতীত রাজনৈতিক বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার বলি দিয়ে সেনাবাহিনীর একজন মেজরের স্বাধীনতার ঘোষণাকে সামনে নিয়ে আসা রব কি করতে চাইছে বা কি বলতে চাইছে সেটাই এই নিবন্ধের প্রধান বিষয়। সেনাবাহিনীর মধ্যে বাঙালি অফিসাররা,বাঙালি সৈনিকরা স্বাধীনতার আগে যারা ন্যূনতম বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, তারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার ঘনিষ্ঠ সহচর জাতীয় নেতৃবৃন্দ এবং তৎকালীন সময়ের ছাত্র নেতৃবৃন্দদের দ্বারা স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হতেন তাতে কোন সন্দেহ নাই। সেটা হয়তো মেজর জিয়াও হতেন বা হয়ে থাকতে পারেন। সেসময় যাদের দেখে এই মেজররা উজ্জীবিত হতেন তার মধ্যে হয়তো আসম আব্দুর রবও ছিলেন, সে সময় স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তারাই ছিলেন নায়কের আসনে । অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সামরিক -বেসামরিক সমস্ত ব্যক্তি তাদের হিরোর আসনে বসিয়েছিলেন ।

কিন্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় স্বাধীনতার পরপরই এই আসম আব্দুর রবের পচন ধরে। তার রাজনৈতিক বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে জাসদ নামক রাজনীতিক দল গঠন করে স্বাধীন বাংলাদেশের হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ তরুণ রাজনৈতিক কর্মীকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়ে পরবর্তীতে নিজের সুবিধার জন্য যখন যা ইচ্ছা ইতিহাস বিকৃতি করে নিজেকে হাসির পাত্রে পরিণত করেছেন । সম্প্রতি মৃত্যুবরণকারী একসময়ের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে জাসদ নেতা এবং তার পরে গণফোরাম হয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রী হওয়া প্রয়াত শাজাহান সিরাজের স্মরণসভায় আসম আব্দুর রব জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার কথা বলেন এবং নিজেকে আবার আলোচনায় আনেন। জিয়ার ঘোষণা পাঠ শুনে নিজেও নাকি উজ্জীবিত হন । এখানেই আসম আব্দুর রবের রাজনৈতিক পচন ধরনের কথা আলোচনায় আসে । সামরিক শাসক জিয়ার আমলে চৌদ্দ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া আসম রব জিয়ার সাথে আপোষ করে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে জার্মানিতে চলে যায়। দেশে ফিরে এসে তার রাজনৈতিক গুরু রাজনীতির আরেক কথিত তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খানের পরামর্শে লোভী আসম আব্দুর রব আরেক সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের সাথে হাত মিলিয়ে এক সময়ে তার নামসর্বস্ব জাসদকে নিয়ে সংসদের বিরোধী দলের নেতার পদ বাগিয়ে নেন । তখন তাকে গৃহপালিত বিরোধীদলীয় নেতা বলা হত। এরশাদের পতনের পর বেগম জিয়ার রোষানলে পড়ে দুই বছর কারাগারে থাকতে হয় । তখন দিনরাত বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে মানুষের মধ্যে কিছুটা নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেন। তারপরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসলে ঐক্যমতের সরকার গঠন করলে আসম আব্দুর রব সেই সরকারের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলে বেশ কিছুদিন চুপচাপ থাকেন আব্দুর রব । তারপরে আবার খোলস বদলিয়ে আস্তে আস্তে স্বমহিমায় ফিরে এসে আবার মিথ্যাচার, আবার ইতিহাস বিকৃতি আর লোভ লালসার ফান্দে পড়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রধান প্ল্যাটফর্ম বিএনপির সাথে হাত মিলিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকে । একজন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী হিসাবে সেটা সে করতেই পারে । কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াই-সংগ্রামের এবং মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক হিসেবে যখন ইতিহাস বিকৃতি করে, যখন কোন একজন সাধারন মেজরকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উপস্থাপিত করে তখনই প্রশ্নটা এসে যায়।

কোন উদ্দেশ্য এবং আবার কি লোভ-লালসায় জীবনের এই শেষ ভাগে এসে নিজের অতীত গৌরবজনক ভূমিকাকে মাটিচাপা দিয়ে কাকে খুশি করতে বা কাকে ছোট করতে এই ইতিহাস বিকৃতির খেলায় মেতে ওঠেছে আসম আব্দুর রব সেটাই প্রশ্ন। অনেকেই বলে ব্যক্তিগত জীবনে ছোটকাল থেকে অনেক অবহেলা এবং অসহায় ভাবে বেড়ে ওঠা আসম আব্দুর রব তার উচ্চবিলাসী লোভ-লালসার কারণেই বিভিন্ন সময় তার রাজনৈতিক পদস্খলন হয়েছে। লোভে পড়ে নিজের রাজনীতির বর্ণাঢ্য ইতিহাসকে মাটিচাপা দিয়ে মনগড়া কথা বলে ইতিহাসের অমোঘ সত্যকে বিকৃতি করে কুচক্রীদের হাতকেই শক্তিশালী করছে আসম আব্দুর রব। তারই একসময়ের সহযোগী প্রায় তারই মত একই লাইনে হাটা শেষ জীবনে অবহেলা অবজ্ঞা নিয়ে বিএনপি নেতা সেজে মৃত্যুবরণ করা স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক ও ছাত্রলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে এই একই ভ্রান্ত রাজনীতির পথ অনুসরণ করেছেন শুধুমাত্র লোভে পড়ে। রাজনৈতিক ইতিহাস বিকৃতি করতে ও নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে এই লোভীরা ইতিহাসের অমোঘ সত্যকে অস্বীকার করে এক অখ্যাত অজ্ঞাত মেজরকে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে ।এটা তার অতীতের নৈতিক স্খলন এর আর একটি অংশ ।

সারা জীবনের এই অপকর্ম ঢাকতে তারা নিজের আবার সুযোগমতো সেই মুক্তিযুদ্ধের গৌরবজ্জল ইতিহাসকে আবার টেনে আনে । যে ইতিহাস তারা একসময় মাটিচাপা দিয়ে, ইতিহাসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, ওই বিএনপি-জামাতের প্ল্যাটফর্মকে তারা যারা শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছে মৃত্যুর আগে ও পরে সেই অপকর্মের দায় স্বীকার করে না। তাদের তখন পরিচয় হয় স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারি কিংবা স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী ।পরিচয় হয় না স্বৈরাচারের গৃহপালিত’ বিরোধীদলীয় নেতা কিংবা মন্ত্রিত্ব মন্ত্রিত্বের লোভে লোভাতুর একজন রাজনীতিবিদের। নিজের হীনস্বার্থ চরিথার্থ করতে নিজের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে মাটি চাপা দিয়ে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া কোন অখ্যাত মেজরকে হিরো বানানোর এই অপচেষ্টা এর আগেও হয়েছে, কিন্তু সফল হয় নাই। যারা এই অপচেষ্টা করেছে তারাই আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। রব রা এর বাইরে না। যেখানে অতীতের নানা ঘৃণ্য কর্মকান্ডের জন্য পাপমোচন করার কথা সেখানে অভ্যাসবশত পাপকর্মেই নিয়োজিত রাখছেন নিজেকে। আফসোস!

লেখক: সম্পাদক,সংসদগ্যালারীটুয়েন্টিফোরডটকম

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top