শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০ ইং, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৫ জিলহজ্জ ১৪৪১ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » করোনা টেস্টের ফি প্রত্যাহার করুন

করোনা টেস্টের ফি প্রত্যাহার করুন

মোঃ আসাদ উল্লাহ তুষার:

সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নাগরিকের করোনা টেস্টে প্রতিজনের কাছ থেকে দুইশত টাকা করে ফি নিবে। যা ইতিমধ্যেই পরিপত্র জারি করে কার্যকর করা হয়েছে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে, করোনার এই মহামারিতে অপ্রয়োজনে অনেকেই অর্থাৎ যার কোন উপসর্গ নাই ফ্রি টেস্টের কারনে সেও টেস্ট করাচ্ছে। মূলত সেটাকে অনুৎসাহিত করতে এই দুইশ টাকা ফি ধার্য্য করা হয়েছে। কি অদ্ভুত যুক্তি। মরণঘাতী এই করোনা ভাইরাসের কারণে সারা পৃথিবী যেখানে স্তব্দ, কর্মহীন, দিশেহারা, অর্থনীতির চাকা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ। মানুষকে যেখানে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা। ঘরে ঘরে গিয়ে যেখানে কোভিড-১৯ শনাক্ত করে যাচ্ছে। নাগরিকদের লকডাউনে রেখে অন্যান্য দেশ যেখানে খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা দিচ্ছে। সেখানে আমরা কি করছি। প্রায় সতেরো কোটি জনসংখ্যার এই দেশে আমরা এখনো প্রতিদিন ১৭০০০ করোনা রোগী শনাক্তে পরীক্ষা করতে পারছিনা। তারপরেও শনাক্তের পরিমাণ দিন দিন যত বাড়ছে মৃত্যুর হারও পাল্লা দিয়ে ততোই বাড়ছে। আমরা যদি পারতাম দেশের সব মানুষকে কোভিড-১৯ টেস্ট করাতে, তাহলে সবচেয়ে ভালো হতো। তা হয়তো আমাদের মতো দেশের পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু যতটুকু সম্ভব সেই পরিমাণ টেস্ট যদি আমরা না করাই তাহলে ভয়াবহ বিপদে পড়তে হবে আমাদের তাতে কোন সন্দেহ নাই । কারণ যদি শনাক্তই করতে না পারি তাহলে চিকিৎসা করব কিভাবে ? আর কীভাবেই বা এই সংক্রমণ রোধ করবো?

প্রতিজন মানুষের কোভিড টেস্ট করতে যদি ২০০ টাকা ব্যয় হয় তাহলে আমাদের দেশের সব মানুষকে করোনা পরীক্ষা করতে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা সরকারের কম খরচ হবে। কারন করোনা টেস্টের প্রকৃত খরচ হয়তো অনেক বেশি। তাই দুইশ করে টাকা নিলে সরকারের খরচ কিছুটা কমবে। আমাদের টেস্টের এখন পর্যন্ত যে অবস্থা তাতে সতের কোটি তো দূরের কথা তার কয় ভাগ করা যাবে তাতে সন্দেহ আছে । আর সেই অবস্থায় করোনার গতিবিধি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা হয়তো আমরা কেউ ভাবতেই পারছিনা । করোনার কারণে দেশের অনেক আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নাই। শুধু দেশের কেন, সারা বিশ্বের এবং সব মানুষের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।বিশ্বজুড়ে পাঁচ লক্ষের উপর মানুষ মারা গেছে। এক কোটির উপরে মানুষ আক্রান্ত হয়েছে আবার তার অর্ধেকের বেশি সুস্থ্য হয়ে বাড়িও ফিরেছেন। করোনার কারণে সারা পৃথিবীর যে পরিমান জানমালের ক্ষতি হয়েছে এবং আরো হবে বলে আশংকা করা হচ্ছে তা স্মরণাতীতকাল তো বটেই কতশত বছর আগে হয়েছিল তার কোন ধারণা নাই। বা আদৌও হয়েছিল কিনা তা গবেষণার বিষয়।

কোভিডের কারণে সরকার যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিচ্ছে বা সাহায্য সহযোগিতা করছে। দেশের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে নানা ধরনের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখাই যেখানে মূল উদ্দেশ্য এবং সেটা করতে গিয়ে সরকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । সরকার প্রধান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।করোনার বিরূদ্ধে দেশবাসীকে নিয়ে এক প্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তারই প্রেক্ষিতে সব নাগরিককে যেখানে করোনা টেস্ট করা দরকার,যেটা সরকার শুরুও করেছে সবাইকে না পারলেও দিন দিন সংখ্যা বাড়ছিল। সেখানে এই ধরনের সিদ্ধান্ত কতটা সুচিন্তিত তা ভেবে দেখা দরকার। এই সিদ্ধান্ত দিতে কারা সরকারকে প্ররোচিত করেছে সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার। এটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোন হটকারী সিদ্ধান্ত, না তাদের যে ধারাবাহিক সমন্বয়ের অভাব তা তদন্ত করা দরকার। যেখানে বেশি বেশি পরীক্ষা করা দরকার সেখানে এই সামান্য দুইশ টাকার জন্য কোভিড টেস্টকে অনুৎসাহিত করা হচ্ছে কার স্বার্থে তা অবশ্যই সরকারকে ভেবে দেখতে হবে।

এখন আসি এই দুইশ টাকা দিয়ে নাগরিকরা যদি নিজেদের করোনা টেস্ট না করে বা করতে অবহেলা করে তখন কি পরিস্থিতি দাঁড়াবে। হয়তো যুক্তি দেয়া যাবে দুইশ টাকা এমন কি যে একজন করোনা রোগী তা বহন করতে পারবে না? হয়তো এই পর্যন্ত যুক্তি ঠিকই আছে, কিন্তু চরিত্র বদল করা করোনা কখন যে কোন রূপে আসছে বা কোন উপসর্গেরই দেখা নেই কিন্তু আক্রমণ করে বসেছে তাদের বেলায় কি হবে?করোনার এই মহামারীর সময় মানুষ যখন কাজকর্মহীন হয়ে অনিশ্চিত জীবন যাপন করছে সেখানে নাগরিকরা নির্দ্বিধায় সুবোধ বালকের মত দুইশ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে দলে দলে করোনা পরীক্ষা করতে যাবে তা ভাবি কেমন করে। যেখানে অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠীর এখন করোনা সম্পর্কে এবং এর ভয়াবহা সম্পর্কে উদাসীন সেখানে চার মাস যাবৎ কাজ কর্মহীন অথচ এ ব্যাপারে নির্লিপ্ত জনগণ যে দলে দলে করোনা পরীক্ষা করবে না, তা হলফ করে বলা যায় । সরকার হয়তো বলতে পারে উপসর্গ যাদের নাই তাদের পরীক্ষা করার প্রয়োজন নাই। তাহলে তো পরিস্থিতি অন্য পর্যায়ে চলে যাবে। উপসর্গহীন অবস্থায় কোভিড নিয়ে যত্রতত্র ঘুরে বেরিয়ে সংক্রমণের মাত্রা কোথায় নিয়ে যাবে যা কল্পনাও করা যায় না। কল্পনা করতেও গা শিউরে উঠে।

তাই সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে যত বেশি সম্ভব একদম উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কোভিড পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে এবং তা অবশ্যই বিনে পয়সায়। প্রয়োজনে ঘরে ঘরে গিয়ে শনাক্ত করতে হবে এবং সেই মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ পৃথিবীর কোন দেশেই সরকারিভাবে কোভিড শনাক্তে কোন টাকা নিচ্ছে না। উল্টো ঘরে ঘরে গিয়ে বা রাস্তাঘাটে ভ্রাম্যমাণ শনাক্তকারী টিম মানুষের কাছ থেকে স্যাম্পল নিয়ে করোনা পরীক্ষা করছে। সরকারের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টিও এই ফি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। বর্তমান সরকারের প্রায় সব খারাপ ভালো উদ্যোগের বিরোধিতাকারী বিএনপিও এই ফি নির্ধারণের বিরোধিতা করেছে । ফি’র বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে গণমাধ্যমে কথা বলেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বিভিন্ন মহল থেকেও এই করোনা টেস্টের ফি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। নাগরিকের এই করোনা পরীক্ষা আপাতদৃষ্টিতে ফ্রিতে হলেও প্রকারন্তরে দেশেরই লাভ হচ্ছে। যে লাভ হয়তো এখনই টাকার অংকে হিসেব করা যাবে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লাভ বয়ে আনবে দেশের এবং দেশের মানুষের। তাই অনতিবিলম্বে করোনা পরীক্ষা বাবদ ধার্য্য করা দুইশ টাকা ফি প্রত্যাহার করে আরো বেশী সংখ্যক এবং উপজেলা পর্যায়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।

লেখকঃ সম্পাদক, সংসদ গ্যালারী টোয়েন্টিফোরডটকম

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top