শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২০ ইং, ১৯ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১২ জিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » “বিএনপি রাজনৈতিক দল, না কোম্পানি”

“বিএনপি রাজনৈতিক দল, না কোম্পানি”

মোঃ আসাদ উল্লাহ তুষার:

প্রখ্যাত সংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী তাঁর নিজের পত্রিকায় সম্প্রতি বিএনপিকে নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছেন।মতিউর রহমান চৌধুরীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বিএনপির উপকারের জন্য বলা যায়। চৌধুরী বিএনপিকে কিছুটা রাজনৈতিকভাবে চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে সমালোচনা করেছেন বলে মনে হয়।

মতিউর রহমান চৌধুরী লিখেছেন, যার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো, শিরোনামটা দিয়েছেন..
“করোনাকালে রাজনীতি, উল্টো পথে বিএনপি”
“রাজনীতি আগেও ছিল না। এখনো নেই। করোনাকালে না থাকারই কথা। তবে আছে ভার্চুয়াল আওয়াজ। সরকার তার গন্তব্যে পৌছাতে মরিয়া। বিরোধীরা মাস্ক পরে দোয়া দুরুদ পড়ছে। রয়েছে মাঝে মধ্যে ভার্চুয়াল ঝলকানি। শব্দের লড়াইয়ে কেউ কারও চেয়ে কম নয়।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই সময়ে কি করছেন? হঠাৎ হঠাৎ তিনি ভার্চুয়াল মিডিয়ায় হাজির হচ্ছেন। তাও লক্ষ্যহীন। তার দল কি চায় তা বোধকরি তিনি জানেনই না। তার অগোছালো, লক্ষ্যহীন কথাবার্তা শুনলে যে কেউ এটা বুঝতে পারবেন। এজন্য রাজনীতির পণ্ডিত হওয়ার দরকার নেই”।

এই ক্ষেত্রে ছোট্ট একটি উদাহরণ, সম্প্রতি ঢাকা মহানগর উত্তর  বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ করোনায় মারা যাওয়ায় সে পদে সহসভাপতি আবদুল আলীম নকিকে ‘ভারপ্রাপ্ত’ করায় এ দলের চিত্র কিছুটা ফুটে উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম যুগ্ম সম্পাদককে ‘ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক’ করার কথা। কিন্তু তা না করে সহসভাপতিকে বেছে নেয়া হয়েছে। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই শাখার নেতারা চরম ক্ষুব্ধ। গঠনতন্ত্র না মানার অভিযোগ তুলে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তারা। কেন্দ্রের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট জবাব না পেলে একাধিক নেতা পদত্যাগেরও ইঙ্গিত দিয়েছেন।

অন্যদিকে মহাসচিব বলেছেন, তিনি কিছুই জানেন না। আমার স্বাক্ষরে এটা হয়নি। এমন আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে। মহাসচিবের জানার বাইরে অনেক কিছুই ঘটে যা তিনি জানেন না। অথচ এসব সিদ্ধান্ত দেয়ার কথা স্বয়ং মহাসচিবের।

ভদ্রভাষায় সরকারের সমলোচনার পাশাপাশি বিএনপির ভুলত্রুটি তুলে ধরে বিএনপির কি করা উচিত তার ইঙ্গিত দিয়েছেন এই নিবন্ধে। আজকে আমার বিএনপিকে নিয়ে এই নিবন্ধন লেখার ইচ্ছাটাও এখান থেকে জাগলো।

একটি রাজনৈতিক দলের গোড়াপত্তন বা প্রতিষ্ঠা কোন সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়েই হয়। বিএনপির জন্ম সেভাবে হয়নি। বিএনপির জন্ম হয়েছে সেনা ছাউনিতে বসে সামরিক একনায়কের ইচ্ছায়। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় তার জন্ম। বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কজনক, দুঃখজনক এক হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে বিএনপি নামক এই প্লাটফর্মের জন্ম। সরকারি সব যন্ত্র ব্যবহার করে রাতারাতি বিরাট একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান খুলে বসে তৎকালীন সেনা শাসক জিয়াউর রহমান । তারপরও বিএনপি হয়তো টিকে আছে বা বার বার ক্ষমতায় গেছে যা অস্বীকার করার উপায় নাই। বার বার ক্ষমতায় গেছে বলেই কি বিএনপি একটি পরিপূর্ণ রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে বলে মনে হয়! বিএনপির জন্মই হয়েছিল বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীকে একই প্লাটফর্মে নিয়ে এসে। হয়েছেও তাই, বিএনপি পরিপূর্ণ কোন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানরূপে গড়ে উঠতে পারেনি বরং এটা একটা স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির প্লাটফর্ম হিসেবে টিকে আছে। যার কারণে এই প্লাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা জিয়া বেঁচে থাকতেই এর অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকোট আকার ধারণ করে এবং চট্রগ্রামে দলের এই দ্বন্দ্ব নিরসন করতে গেলে দুঃখজনকভাবে সেনাবাহিনীর কিছু অফিসারের হাতে প্রাণ হারায়।

জিয়ার মৃত্যুর পর তার বিধবা পত্নী খালেদা জিয়া দলের দায়িত্ব নিয়ে বেশ সফল হয়েছেন এবং দলকে দুইবার ক্ষমতায়ও নিয়েছেন। তারপরও কি বিএনপি একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে, না কোন প্রাইভেট বা পাবলিক লিমিটেড কোন কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের যে স্ট্রাকচার না নীতি-আদর্শ থাকার কথা সেটা কি বিএনপিতে আছে? একটি দলের মধ্যে নূন্যতম অভ্যন্তরীণ যে গণতন্ত্র থাকার কথা সেই গণতন্ত্রের লেশমাত্র কি বিএনপিতে আছে । বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটি কত সংখ্যায়, কোন কোন পদ কত জন, তাকি বিএনপি’র কোন নেতৃত্ব বলতে পারবে। একটি কোম্পানিতে যেমন তার মালিক চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর যখন যা ইচ্ছা করতে চায় তাই করতে পারে। যখন যাকে বসাতে চায়, যখন যাকে সরাতে চায় কোন কারন ছাড়াই তা করতে পারে বিএনপি তো ঠিক একই অবস্থা দীর্ঘদিন থেকে বিদ্যমান। বিএনপিতে কেউ কোনদিন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বা চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব পায় নাই ।

দলের চেয়ারপার্সন বা চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে বা চেয়ারম্যান বিদেশ গেলে বা কারাগারে গেলে তার অবর্তমানে দলের কোনো সিনিয়র নেতা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পায় বলে যে প্রচলন আছে সেটা কি কোনদিন বিএনপিতে হয়েছে? দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জেলে গেলে দণ্ডিত হয়ে পলাতক অবস্থায় বিদেশ থাকা দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান কে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার মত হাস্যকর কান্ড বিএনপিতে ঘটেছে। লন্ডনে অবস্থান করে কিভাবে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে এটা কোন কোম্পানি না হলে কি সম্ভব? একটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র কি এটা পারমিট করে? ঠিক একটি কোম্পানির মতই, কোম্পানির মালিক যেখানে তার পদও সেখানে । যখন যাকে বহিষ্কার করা, পদে নিয়োগ দেওয়া, পদ থেকে বঞ্চিত করা এগুলো বিএনপি তো হরহামেশাই হয়ে থাকে। কোনদিন দলের কার্যনির্বাহী কমিটির মিটিং হয়েছে কিনা কেউ বলতে পারেন না। কত সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি তাই তো কেউ বলতে পারে না। দলের নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক বা রাজনৈতিক বিশ্লেষক কেউ বলতে পারবেনা বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটি কত সদস্য’র।

বিএনপি সরকারে থাকলেও যেমন লেজেগোবরে করে ফেলে,ঠিক বিরোধী দলে থাকলেও তাই করে । কারণ বিএনপি’র মাথায় সারাক্ষণই থাকে ক্ষমতা আর ক্ষমতা। তাই বিরোধী দলে থাকলে সুনির্দিষ্টভাবে তেমন কোনো কাজ বা রাজনীতি বা আন্দোলন কোন কিছুই গড়ে তুলতে পারে না । শুধুমাত্র ক্ষমতার কথা চিন্তা করে যখন একটি রাজনৈতিক দল পথ চলে তখন যদি ক্ষমতায় যেতে না পারে এমন লেজেগোবরে অবস্থা হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই দলে কেউ আদর্শের জন্য আসে না, এই দলে আসে হালুয়া-রুটি খাওয়ার জন্য ভোগ বিলাসের জন্য। অন্য অনেক দল করতে পারে না বা দল করে সুবিধা করতে পারবে না সেই চিন্তা থেকে এই দল অর্থাৎ বিএনপি করে অনেকেই । আর ক্ষমতার যাওয়ার লোভে বিএনপিতে কোন সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না । বিরোধীদলে থাকতে হঠকারী দেশবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে পথ চলে, সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা লক্ষ্য নিয়ে এগোতে পারে না। অন্যের ব্যর্থতায় নিজের সাফল্য খুঁজে বেড়ায়, নিজেরা কোন বুদ্ধি করে সফলতা অর্জন করবে তেমন কোনো চিন্তা বিএনপিতে আছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেনা। এই প্লাটফর্মে কেউ কাউকে মানে না,কর্তার ইচ্ছায় যেমন কর্ম ঠিক তেমনি শীর্ষ পদের দুএকজনের ইচ্ছাতেই দল চলে। অন্যান্য দলেও শীর্ষ নেতাদের কথাই অনেক সময় শেষ কথা। কিন্তু তারপরেও দলের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ’র কথাকে মূল্যায়ন করা হয় বা গণতন্ত্রের চর্চা কিছুটা হলেও করা হয়। কিন্তু বিএনপি’র বেলায় দেখা যায় বিএনপি’র কোন কর্মী তো দূরের কথা, মধ্যম সারির নেতারাও জানেনা সিদ্ধান্ত কোথা থেকে আসে। দলীয় প্লাটফর্মে আলোচনা করা হয় না, সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে জানানো হয় না, গায়েবী আওয়াজ আসে সেটা যে প্রিন্ট করে বা টাইপ করে বা পত্রিকায় দেয় সেই জানতে পারে আর প্রকাশ হওয়ার পরে দলের নেতাকর্মীসহ দেশের মানুষ জানতে পারে ।

আগেই বলা হয়েছে বিএনপি বার বার ক্ষমতায় গেছে দল হিসেবে ও দেশের অন্যতম একটি বৃহত্তর প্লাটফর্ম হিসেবে। এটা হয়েছে অন্য দলের ব্যর্থতার কারনে। পরিষ্কার করলে করে বললে বলা যায় বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগসহ অন্য কয়েককটি রাজনৈতিক দলের ভুলের কারণে। বিএনপি দুবার ক্ষমতায় গেছে এবং বড় দল হিসেবে এখনো টিকে আছে একথা সত্য। আরো খোলাসা করে বললে বলা যায় আওয়ামীলীগ বা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিএনপি এখনো টিকে আছে। অর্থাৎ যতদিন আওয়ামীলীগ টিকে থাকবে, পাশাপাশি হয়তো বিএনপিও টিকে থাকবে। সেটা এরকম অগোছালোভাবেই, একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে যেভাবে থাকার কথা তা না থেকে,একটি বিরোধী নানা মত নানা পথের মানুষের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে হয়তো টিকে থাকবে । যা দেশের জন্য দুঃখজনক,যা কোনভাবেই মঙ্গলজনক নয়। দল হিসেবে যদি বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানরূপে টিকে থাকতো, ন্যূনতম গণতন্ত্রের চর্চা হতো, তাহলে হয়তো দেশের জন্য মঙ্গল হতো। বিরোধী দলে থেকেও যে দেশের জন্য কাজ করা যায়, দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করা যায় তার ভুরি ভুরি উদাহরণ দেশে দেশে আছে। কিন্তু বিএনপিতে এসবই অনুপস্থিত, কারণ বিএনপি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে এখনও গড়ে উঠতে পারেনি। এটা এখন একটা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আছে আরও পরিষ্কার করে বললে বলা উচিত এটা একটি কোম্পানি রূপে টিকে আছে। যে কারণে বিএনপি মনা শুভাকাঙ্ক্ষীরা বিএনপিকে চাঙ্গা করতে যতই উপদেশ দেন না কেন, বিএনপি উল্টা পথেই হাটবে। এই উল্টা পথে হেটেই হয়তোবা অতীতে সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু সেটা যে বার বার হবে না, বা হয় না তা কি আদৌ বুঝছে বিএনপির নেতৃত্ব। বিগত তিন টার্ম ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায়ও অন্ততঃ বোঝা উচিত ছিল।

লেখক:সম্পাদক,সংসদগ্যালারীটুয়েন্টিফোরডটকম

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





Leave a Comment

You must be logged in to post a comment.

© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top