শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২০ ইং, ১৯ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১২ জিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » ‘শুভ জন্মদিন আওয়ামী লীগ’

‘শুভ জন্মদিন আওয়ামী লীগ’

মোঃ আসাদ উল্লাহ তুষার:

‘বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ’ ইতিহাসে এই তিনটি নাম অমলিন, অবিনশ্বর। ইতিহাসে এই তিনটি নাম একই সূত্রে গাঁথা। আওয়ামী লীগ মানেই দেশের স্বাধীনতা, স্বাধীন মানচিত্র, স্বাধীন পতাকা। তেমনি ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাফল্য ও অর্জনের নামও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী অন্যতম বৃহৎ প্রাচীন রাজনৈতিক দলও আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন রোজ গার্ডেনে সম্মেলনের মধ্যদিয়ে যাঁর পথ চলা শুরু হয়। প্রথম সেই সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সহ-সভাপতি হন আতাউর রহমান খান, শাখাওয়াত হোসেন ও আলী আহমদ। টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে রফিকুল হোসেনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়। কোষাধ্যক্ষ হন ইয়ার মোহাম্মদ খান। এসময় শেখ মুজিব কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন। অন্যদিকে, পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনটির নাম রাখা হয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। এর সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

২৪ জুন বিকেলে নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে প্রকাশ্যে জনসভা করে। সংগঠনের জন্মের দিনই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার আদায়ের লক্ষ শুরু হয়। আওয়ামীলীগের হাত ধরেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ‘৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, পরবর্তীতে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন,৬৬’র ছয় দফা আন্দোল ‘৭০ এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে জয়ী হয়ে ‘৭১ এ সুমহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ।

১৯৫২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরের বছর ঢাকার ‘মুকুল’ প্রেক্ষাগৃহে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে ‘বঙ্গবন্ধু’কে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। তখন বঙ্গবন্ধু হননি। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন বঙ্গবন্ধু। উল্লেখ্য যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ছিলো তৎকালীন পাকিস্তানে প্রথম বিরোধী দল। এর মধ্যে ১৯৫৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দলের তৃতীয় সম্মেলনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়; নতুন নাম রাখা হয়: ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্বসহ ৪২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে। শুরুর দিকে আওয়ামীলীগের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার স্বীকৃতি, এক ব্যক্তির এক ভোট, গণতন্ত্র, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং তৎকালীন পাকিস্তানের দু’অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ। মোট কথা জন্মের শুরু থেকে জনগণের, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আওয়ামী লীগ সংগ্রাম শুরু করে।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রধান ভূমিকা পালন করে। ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর দলটি কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সঙ্গে মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। ৫৪’র যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনেও তৎসময়ের তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিপুল জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাছে আওয়ামী লীগের বিরাট গ্রহণযোগ্যতা অর্জিত হয়।

১৯৫৪ সালের মার্চের আট থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন পায়। এরমধ্যে ১৪৩টি পেয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর একচ্ছত্র জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা ও ভূমিকায় বিরাট বিজয় অর্জিত হয়।২৪ বছরের পাকিস্তান শাসনামলে আওয়ামী মুসলিম লীগ আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে দু’বছর প্রদেশে ক্ষমতাসীন ছিল এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রে ১৩ মাস কোয়ালিশন সরকারের অংশীদার ছিল।

জন্মের কিছুদিন পরপরই দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা ভাসানী,সহ সভাপতি আতাউর রহমান খানসহ কয়েকজন নেতা দল ত্যাগ করে আলাদা আলাদা নতুন দল গঠন করেন। অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপমহাদেশের বোধহয় একমাত্র রাজনৈতিক নেতা যিনি মন্ত্রীত্ব ত্যাগ করে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব থাকেন। এই সময়ে এসে বোঝা যায় তাঁর সেই দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারনেই আওয়ামী লীগ গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগঠনে পরিণত হয় এবং তিনি নিজেও শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা হন এবং একটি স্বাধীন দেশ উপহার দেন। তারজন্য তাঁকে বিশাল ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। চৌদ্দ বছর জেলের প্রকোষ্ঠে থাকতে হয়। ফাঁসির দড়ি ঝুলতে থাকে তাঁর সামনে ।

একটি রাজনৈতিক দল গঠনের চার পাঁচ বছরের মাথায় ক্ষমতায় যাওয়া এবং দুইযুগ সংগ্রাম, সাধনা,নির্যাতন নিপীড়ন ভোগ করে স্বাধিকারের আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে অনেক ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করার পিছনে মুখ্য ভূমিকায় যে দল তাঁর নাম আওয়ামী লীগ। যার চালিকা শক্তি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। অনেক বড় বড় নেতা আওয়ামী লীগে থাকলেও দলের কর্তৃত্ব নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু যখন পরিপূর্ণভাবে আসীন হন তখনই বাঙালি তাঁর সুদৃঢ় নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। বঙ্গবন্ধুর কারণেই আওয়ামী লীগ বাংলার ঘরে ঘরে সুদৃঢ় অবস্থান তৈরী করে। যার ফলশ্রুতিতে আওয়ামী লীগ গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সংগঠনের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়। আর সেই দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হন জাতির পিতা।

আওয়ামীলীগ জন্মের পর থেকে সরকারে বা বিরোধীদলে যেখানেই থাকুক সবসময় গতিশীল এবং মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। পাকিস্তানের চব্বিশ বছরে মাত্র তিন সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় ছিলো। বাদবাকি সময় বিরোধীদলে থাকলেও মানুষের জন্য লড়াই সংগ্রাম করে গেছে এবং সফল হয়েছে। যাঁর ফলশ্রুতিতে আওয়ালীগের সবচেয়ে বড় অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সংগঠন হিসেবে যাঁর নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ক্ষমতা ও ক্ষমতার বাইরে যেখানেই থাক আওয়ামী লীগ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল মূল লক্ষ্য। ক্ষমতায় থাকলে অধিকার বাস্তবায়ন করেছে, বিরোধীদলে থাকলে অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছে এবং অধিকাংশ সময় জনগণের অধিকার আদায় করে ছেড়েছে। সে সামরিক সরকারই হোক বা তাদের আশ্রিত অন্য কোন সরকারই হোক। আওয়ামীলীগের জন্মের এই একাত্তর বছরে বাংলাদেশের যা অর্জন তা অর্জিত হয়েছে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বেই এবং নেতা হিসেবে যাঁর নেতৃত্ব দিয়েছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁরই সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যিনি বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বার বার মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ শত বাধা অতিক্রম করে বিশ্বের বুকে বুকটান করে মাথাউচু করে দাঁড়িয়ে আছে এবং সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে ।

৭১ বছর বয়সের একটি রাজনৈতিকদল জন্মের পর থেকে প্রায় আজ পর্যন্ত সমানতালে গতিশীল একটি সংগঠন হিসেবে তাঁর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। মাঝে কয়েকবার সামরিক বেসামরিক স্বৈরাচারের কবলে পড়তে হয়েছে। এই দলের প্রাণভোমরা বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নির্মম নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, জেলখানায় চারজন শীর্ষ স্থানীয় জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়েছে।পরে বিভিন্ন সময়ে দলের অনেক বড়বড় নেতাকে হত্যা করা হয়েছে এবং অমানুষিক নিপীড়িরণ নির্যাতন চালানো হয়েছে। তারপরও আওয়ামীলীগ মাথা উঁচু করে আজো দাঁড়িয়ে আছে। দলের বর্তমান সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও অন্তত বিশ থেকে একুশবার হত্যা চেষ্টা চালানো হয়েছে এবং একুশে আগস্টে গ্রেনেড হামলা করে তাঁকেসহ আওয়ামীলীগ নেতৃত্বকে একেবারে শুন্য করে দিতে চেয়েছিল, কোন কিছুতেই আওয়ামীলীগ ও কোটি কোটি নেতাকর্মীরা পিছু হোটেনি। আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং সফল হয়েছে।

আওয়ামীলীগ বাংলাদেশ তো বটেই এই উপমহাদেশের মূলধারার একটি প্রধান রাজনৈতিক দল। একটি দেশের মূলধারার শিল্পসংস্কৃতি,অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ধর্মীয় গোঁড়ামিহীন মূল্যবোধ, গণতন্ত্র, পরমতসহিষ্ণুতা, নারীর স্বাধীনতা,খেলাধুলা,জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম অন্যান্য যেসব মূল বৈশিষ্ট্য একটি দেশ ধারণ করে তার নেতৃত্ব দিয়ে আসছে আওয়ামী লীগ। শিল্পসংস্কৃতি,ধর্মীয় গোঁড়ামি, অসাম্প্রদায়িকতা,গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা যেখানেই বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে তা রক্ষা করতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামীলীগ।আওয়ামীলীগের কোটি কোটি সমর্থক ক্ষমতার জন্য এই দল করে না। এই দল শুধু একটি রাজনৈতিক দল না, একটি অনুভূতির নাম।প্রয়াত দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যা এক বক্তব্যে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও প্রায়ই বলে থাকেন আওয়ামী লীগ একটি পরিবার। যথার্থই আওয়ামী লীগ একটি পরিবার। যে কারণে ক্ষমতা ও ক্ষমতার বাইরে থাকলেও কিছু ভুলত্রুটি বাদে আওয়ামীলীগ গতিশীল ও জনসম্পৃক্ত থাকে। তাই ৭১ বছর বয়সের আওয়ামী লীগ বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে টানা তিনবার ক্ষমতায় আসীন।তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল।কোন কিছু চাওয়া পাওয়া ছাড়াই গ্রামের একদম খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষটি আওয়ামীলীগ করে মনের টানে দেশের টানে, বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে ‘শেখের’ মাইয়ার জন্য। এখানেই আওয়ামী লীগের শক্তি। এক কথায় মাটি ও মানুষের দল আওয়ামী লীগ। শুভ জন্মদিন আওয়ামী লীগ।

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





Leave a Comment

You must be logged in to post a comment.

© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top