শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২০ ইং, ১৯ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১২ জিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » ‘ডাক্তার বাঁচান’

‘ডাক্তার বাঁচান’

মোঃ আসাদ উল্লাহ তুষার:

কোভিড -১৯ বা করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা দিতে প্রতিদিনই ডাক্তারদের মৃত্যুর খবর ভয়াবহ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাঁরা চিকিৎসা দিয়ে রোগী সারাবে তাঁরাই যখন গণহারে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুবরণ করছে তখন বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বসহকারে নেয়া উচিত বলে মনে করি।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করোনা রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩৭জন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে ৷ ‘উপসর্গ নিয়ে’ আরো পাঁচ চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে৷ পত্র পত্রিকার খবর অনুযায়ী এর সংখ্যা আরো কয়েকজন বাড়তে পারে । এ ছাড়াও প্রায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলায় এক বা দুইজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে।

চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনা মোকাবিলায় সম্মুখ সারির যোদ্ধা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই স্বীকৃতি দিয়েছে। এই সম্মুখযোদ্ধারাই আমাদের দেশে দুঃখজনকভাবে বেশি সংখ্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মারাও যাচ্ছেন। এদিকে বিএমএ’র হিসাবে, এ পর্যন্ত সারাদেশে করোনায় ১ হাজার ৩১ জন চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন। টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৩১ জন। বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের মতে, সারাদেশে ১ হাজার ১৬০ জন নার্স আক্রান্ত হয়েছেন। সবমিলে স্বাস্থ্য সেবাদানকারী করোনাযোদ্ধাদের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছেন ৩ হাজার ৫০২ জন। সংক্রমণের এ সংখ্যা বা হার বৈশ্বিক হারের চেয়ে বেশি। দেশে মোট আক্রান্তের ৪ শতাংশই চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী।

অন্যদিকে ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটিস-এফডিএসআর নামে একটি সংগঠনের তথ্যানুযায়ী, দেশে ১ হাজার ৫০ জনের উপরে চিকিৎসক কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন৷ এ সংখ্যাও যে কিছু বাড়বে তাতে কোন সন্দেহ নাই।

সম্মুখ সারির করোনাযোদ্ধারাই যদি এভাবে আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করেন তবে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব ও হতাশা কতদূর পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। যে কোনো রোগ হলে মানুষ চিকিৎসকের কাছে যায়। করোনা রোগে আক্রান্ত হলেও এর ব্যতিক্রম হওয়ায় কথা নয়। চিকিৎসকরা হলেন রোগীদের বল-ভরসা। তারাই এভাবে আক্রান্ত হলে, মারা গেলে  সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?

তাদের সুরক্ষার অভাব তাদের জন্য এবং অন্যদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। ওদিকে চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় তাদের অতিরিক্ত ডিউটি পালন করতে হচ্ছে, যাতে তাদের বিশ্রাম ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ ব্যাহত হচ্ছে। এটাও তাদের মধ্যে সংক্রমণ বিস্তারের অন্যতম কারণ হতে পারে। এই সম্মুখযোদ্ধাদের প্রটেকশন আগে জরুরী। এদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসা উচিত।

যে সকল চিকিৎসক ইতিমধ্যেই আক্রান্ত হয়েছেন বা কোভিড-১৯ এর কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁরা প্রায় সবাই করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে বা এই করোনাকালীন সময়ে হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন এবং দুঃখজনক ভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। এত সংখ্যক ডাক্তারের মৃত্যু দেশের জন্য এক বিরাট ক্ষতি ।

বৈশ্বিক এই মহামারিতে ফ্রন্টলাইনার এই যোদ্ধারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শুধু যে কাজ করে যাচ্ছেন তাই না তাঁরা দুঃখজনক ভাবে মৃত্যুবরণও করছেন। প্রায় অধিকাংশ দেশেই এই ডাক্তারদের দুঃখজনক মৃত্যুর খবর আমরা দেখতে পাচ্ছি। কোন দেশে তুলনায় কম, কোন দেশে বেশি। আবার কোভিডে আক্রান্ত ডাক্তাররা সুস্থ্য হয়ে আবার রোগীর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করছেন। ডাক্তারী পেশাটাই এমন। সংক্রামক রোগ হোক আর অসংক্রামক রোগ হোক চিকিৎসা দিবেন ডাক্তাররাই। সাথে থাকেন নার্স বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা, চিকিৎসায় যাদের অবদানও কম নয়। তারাও বেশ আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মৃত্যুবরণ করছেন।

বাংলাদেশে কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের পর রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্য কর্মী আক্রান্ত বা মৃত্যু হলে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা আগেই দিয়েছিল সরকার৷ সেই অনুযায়ী ডা. মঈন উদ্দীনের পরিবার থেকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের দাবী করা হয়েছে৷ গত ২৭ এপ্রিল ডা. মঈনের স্ত্রী চৌধুরী রিফাত জাহান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে এ আবেদন করেন৷ গত বুধবার মন্ত্রণালয় থেকে টাকা ছাড়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে৷ ইতিমধ্যে এ অর্থ ছাড়া হয়েছে৷ ডা. মঈনের পরিবারই প্রথম সরকারি কর্মকর্তার পরিবার হবে যারা করোনার ক্ষতিপূরণের টাকা পেলেন৷ গত ১৫ এপ্রিল সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক মঈন উদ্দীন কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মারা যান৷ দেশে এ রোগে মারা যাওয় প্রথম চিকিৎসক তিনি৷

অন্যদিকে খুবই দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে খুলনায়। সেখানে রোগীর স্বজনদের হামলায় রকিব উদ্দিন (৬০) নামে এক চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। শেখ আবু নাসের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (১৬জুন)সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়। ডা. রকিব নগরীর গল্লামারী এলাকায় অবস্থিত রাইসা ক্লিনিকের মালিক এবং বাগেরহাট মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (ম্যাটস) অধ্যক্ষ।

চিকিৎসা অবহেলায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ এনে মৃত্যুর আগের দিন সোমবার রাতে ওই মৃত ব্যক্তির কয়েকজন স্বজন ডা. রকিব উদ্দিনের ওপর হামলা চালান।

নিহত ডাক্তারের ছোট ভাই খুলনা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক সাইফুল ইসলাম জানান, নগরীর মোহাম্মদ নগর পল্লবী সড়কের বাসিন্দা আবুল আলীর স্ত্রী শিউলী বেগমকে রোববার( ১৪ জুন ) সিজারের জন্য নগরীর রাইসা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ওই দিন বিকেল ৫টায় অপারেশন হয়। বাচ্চা ও মা প্রথমে সুস্থ ছিলেন। পরে রোগীর রক্তক্ষরণ হলে পরদিন সোমবার সকালে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। পরে ঢাকায় নেওয়ার পথে সোমবার রাতে শিউলী বেগমের মৃত্যু হয়।

এই ঘটনার ভয়াবহতা কল্পনাও করা যায় না। অথচ ওই ডাক্তার রকিব উদ্দিন ওই এলাকায় গরীবের ডাক্তার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। চিকিৎসা দিতে রোগী মারা যায়। মারা যাওয়া একদম অস্বাভাবিক না, কিন্তু ইচ্ছে করে বা অবহেলা করে সহজে কেউ রোগী মেরে ফেলে না। ডাক্তার রকিব উদ্দীন এর বেলায় তা কেউ মানছে না। কিন্তু রোগীর স্বজন নামধারী যে সন্ত্রাসীরা তাকে নির্মম আঘাত করে মেরে ফেললো তা সমাজের জন্য, বিশেষ করে চিকিৎসক সমাজের জন্য একটা ভয়াবহ আতঙ্ক। যে রোগী মারা গেছে তার পরিবারের ক্ষতির কথাও স্মরণযোগ্য। তাই বলে চিকিৎসার অবহেলার কথা বলে চিকিৎসক পিটিয়ে মারা ভয়ংকর অপরাধ। এই অপরাধের সাথে যারা জড়িত তদন্ত পূর্বক তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। চিকিৎসায় অবহেলার নানা খবর প্রায়ই পত্র পত্রিকায় আসে, তাই বলে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে। যা কল্পনারও অতীত। আমরা কোথায় চলেছি? করোনায় যখন এই সম্মুখযোদ্ধা ডাক্তার দেবদুতের মত ভূমিকা পালন করছেন এবং নিজের জীবন বিলিয়ে দিচ্ছেন তখন এমন খবর বিবেকবান মানুষ মাত্রই আহত বোধ করছেন।

কোভিডের এই মহামারিতে চিকিৎসকদের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত মানসম্মত স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী দিতে হবে। চিকিৎসা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হলে তাঁদের উন্নত মানের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁদের মানসম্পন্ন আইসলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। এই সময়ে দেশের সব বড় বড় তারকা হোটেলগুলোকে ডাক্তারদের জন্য ছেড়ে দিতে হবে। তাঁদের পরিবারের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে প্রণোদনার ব্যবস্থাকে সাধুবাদ জানাই। মৃত্যুর ক্ষতিতো অর্থ দিয়ে বিবেচনা করা যায় না। এই প্রণোদনা ঠিক আছে, কিন্তু ডাক্তারদের সুরক্ষা দিয়ে তাঁদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। যেভাবে ডাক্তাররা আক্রান্ত হচ্ছে ও মৃত্যুবরণ করছে এভাবে চলতে থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধসে পড়বে। তাই সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরির আগেই আমাদের চিকিৎসকদের বাঁচতে হবে। তাঁদের সুরক্ষায় সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে অন্য সবার স্বার্থে। যেসব ডাক্তার আক্রান্ত হয়েছেন তাঁদের দ্রুত সুস্থ্যতা কামনা করছি। যারা আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে শহীদ হয়েছেন তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। আর যারা আক্রান্ত হয়ে সুস্থ্য হয়ে আবার চিকিৎসায় ফিরেছেন তাঁদের স্যালুট। আপনারাই আমাদের আশার আলো।

লেখকঃ সম্পাদক,সংসদগ্যালারীটুয়েন্টিফোরডটকম

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





Leave a Comment

You must be logged in to post a comment.

© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top