বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২০ ইং, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১২ জিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » ‘তিন নক্ষত্রের জন্য শোকগাঁথা’

‘তিন নক্ষত্রের জন্য শোকগাঁথা’

মোঃ আসাদ উল্লাহ তুষার:

শোকে মুহ্যমান আওয়ামীলীগ । পরপর তিনজন কেন্দ্রীয় নেতাকে হারিয়ে সর্বত্র শোক বিরাজ করেছে আওয়ামী লীগে। শোকাহত গোটা আওয়ামী লীগ পরিবার ।কোভিড-১৯ এর কারণে বিশ্ব আজ নতুন এক পরীক্ষার সম্মুখীন। অদেখা এই প্রাণঘাতী ভাইরাস থেকে ধনী দরিদ্র,ক্ষমতাশালী,ক্ষমতাহীন,মন্ত্রী, এমপি, নেতা- জনতা কেউই রক্ষা পাচ্ছেন না। মারাত্নক ধরণের এই ছোঁয়াচে রোগ থেকে বাঁচার উপায় নিজেকে সম্পূর্ণ আইসুলেটেড করে রাখা। সাড়া পৃথিবীব্যাপী যতটা সম্ভব মানুষ নিজেকে আইসিলেশনে রেখে এই অদেখা নতুন ভাইরাসকে মোকাবেলার চেষ্টা করছে । একদম নতুন ধরণের এই রোগ মেকবেলার কোন ধরণ ধারণ কারো জানা ছিল না। এর প্রতিষেধকও এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নাই । বিশ্বব্যাপী মানুষ নিজেদের মত করে সংক্রমণ থেকে বাঁচতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেক দেশেরই মন্ত্রী মিনিস্টারসহ উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ এই মরণঘাতী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়েছেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ইতিমধ্যেই দুঃখজনকভাবে মৃত্যুবরণও করেছেন।

বিশেষ করে যারা মানুষের সান্নিধ্যে বেশি বেশি থাকছেন বা মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন তাঁরাই আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই মানুষের কল্যানে বা এই বিপদের দিনে পাশে থাকার চেস্টা করছেন। যার মধ্যে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে ডাক্তার, অন্যান্য সেবা খাতের পুলিশসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন এবং দুঃখজনকভাবে মৃত্যুবরণ করছেন।একইভাবে জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে জনসাধারণের কাছাকাছি যাচ্ছেন। করোনা ভাইরাস শুরু হওয়ার পর থেকে এমপি মন্ত্রীদের মতোই অনেক রাজনীতিবিদ বিশেষ করে আওয়ামীলীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা এই ভাইরাসের কারণে লকডাউনে পরে কর্মহীন মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁরা নিরলসভাবে সাধ্যমতো মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

করোনা ভাইরাসের এই মহামারীর সময় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আওয়ামীলীগের তিনজন কেন্দ্রীয় বর্ষীয়ান নেতা সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ ও সিলেটের সাবেক জনপ্রিয় মেয়র বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান ইন্তেকাল করেছেন। তিনজনই ছিলেন আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ সংগঠক। তারমধ্যে দুজন তো ছিলেন বাঁরংবার নির্বাচিত জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধি । তন্মমধ্যে মোঃ নাসিম করোনা পজেটিভ থেকে নেগেটিভ হয়ে পরে মারাত্মক ধরণের স্ট্রোক করে সপ্তাহধরে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জালড়ে ১৩ জুন বেলা ১১.১০ মিনিটে না ফেরার দেশে চলে যান। ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ একইদিন রাত সাড়ে এগারোটার দিকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে সিএমএইচে রওনা হলে পথিমধ্যে ম্যাচিভ হার্ড এট্যাকে মৃত্যু বরণ করেন। মৃত্যুর পরে তার করোনা পজেটিভ আসে। তাঁদের দাফন কাফন শেষ করে দিন শেষে রাত তিনটার দিকে সিলেটের জনপ্রিয় সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। যিনি কয়েকদিন আগেই করোনা পজেটিভ নিয়ে সিএমএইচে ভর্তি ছিলেন। এই তিনজনের মৃত্যু দেশের জন্য এক বিরাট ক্ষতি। বিশেষ করে আওয়ামীলীগের জন্য এক বিরাট ধাক্কা। আওয়ামীলীগ হত্যা ক্রু নানা ধরনের ষড়যন্ত্র, নিপীড়ন নির্যাতন সহ্য করে পাথর হয়ে বেঁচে থাকা পোড় খাওয়া একটি দলের নাম। ১৯৭৫ সালের পনেরই আগস্টের হৃদয়বিদারক শোকাবস্থা সহ্য করে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা আজও কাজ করে যাচ্ছে। এমন শোকের সাথে হয়তো অন্য কোন শোকের তুলনা করা চলে না। এছাড়াও একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলাও দেশবাসীর মতো আওয়ামী লীগকে শোকাগ্রস্থ করেছিল।

কিন্তু পরপর আওয়ামীলীগের পোরখাওয়া তিনজন শীর্ষনেতার না ফেরার দেশে চলে যাওয়ায় আওয়ামীলীগের সর্বত্র শোক বিরাজ করছে। তিনজন নেতাই ছিলেন আওয়ামীলীগের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীবান্ধব জনপ্রিয় নেতা। ছাত্রলীগের রাজনীতি দিয়ে শুরু করা যুবলীগ হয়ে জেলা, মহানগর থেকে উঠে আসা কেন্দ্রীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন তাঁরা। তিনজনই ছিলেন দলের সভাপতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন,আপনজন।এই তিনজনের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শোকে মুহ্যমান, সংসদের বক্তৃতায় ও শোকবাণীতে তিনি সেকথা বলেছেনও। শুধু দলীয় সভাপতি বা এই নেতাদের স্ব স্ব এলাকায়ই নয় দেশব্যাপী আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা শোকাগ্রস্থ। এই মুহূর্তে তাঁদের মৃত্যুতে আওয়ামীলিগের এক বিরাট ক্ষতি, যা সহজে পূরণ হবার নয়। সত্তর বছর বয়সের এই উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই রাজনৈতিক দলের অনেক সদস্যই এখন বয়সের ভরে প্রবীণ। অনেকেই ইতিমধ্যে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। অনেকেই সামরিক স্বৈরাচারদের দ্বারা বা ঘাতকের বুলেটে প্রাণ দিয়েছেন, এই সব মৃত্যু শোককে সহ্য করেই আওয়ামীলীগ এতদিন পথ চলে এসেছে। কিন্তু বৈশ্বিক এই মহামারিতে পরপর তিনজন খাঁটি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের  সৈনিকের মৃত্যুতে শোকাগ্রস্থ পুরো আওয়ামী লীগ পরিবার। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে এবং বার্ধক্যজনিত কারণে এই কয়মাসে কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ বর্তমান ও সাবেক এমপি মন্ত্রী ইহলোক ত্যাগ করেছেন। দুজন মন্ত্রী সহ আরো বেশ কয়েকজন শীর্ষনেতা চিকিৎসাধীন আছেন।

মোহাম্মদ নাসিম সিরাজগঞ্জের কাজিপুর থেকে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সিকি শতাব্দী ধরে তিনি পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। চারটি মন্ত্রণালয়ের দশ বছর মন্ত্রী ছিলেন, বিরোধীদলের হুইপ, চীফ হুইপ ছিলেন।আমৃত্যু একটানা প্রায় চল্লিশ বছর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন। মোহাম্মদ নাসিমের সংসদীয় আসনে তাঁর পিতা শহীদ এম মনসুর আলী থেকে শুরু করে তাঁর সন্তান জয় পর্যন্ত ১৯৫৪ সাল থেকে ছয় দশকের বেশি সময় সংসদে আওয়ামীলীগের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর শোকে পাথর আজ নিজ জেলা সিরাজগঞ্জবাসী ।

ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে যুবলীগ হয়ে পরে গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের দীর্ঘদিন সাধারণ সম্পাদক থেকে আওয়ামীলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তাঁকে সম্পাদক করেই আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদকের পদ চালু হয়। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজ নির্বাচনী এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ছিলেন। এই দায়িত্ব তিনি অত্যন্ত আস্থার সাথে দীর্ঘদিন যাবৎ পালন করে আসছেন। তিনি সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক ও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান সিলেট সিটি করপোরেশনের টানা চারবার কমিশনার, দুইবার পৌর চেয়ারম্যান ও দুইবার নির্বাচিত সিটি মেয়র ছিলেন। ছাত্রবস্থায় নির্বাচিত হয়ে টানা চল্লিশ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন পুণ্যভূমি সিলেট নগরীর। কর্মী ও জনবান্ধব নেতা যাকে বলে তাই ছিলেন। দীর্ঘদিন মহানগর আওয়ামীলিগের শীর্ষ নেতৃত্ব দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা করে নিয়েছিলেন। ছিলেন শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন। তাঁর শোকে শোকাগ্রস্থ আজ পুণ্যভূমি। তাঁর চিরবিদায়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ চোখের জল ফেলেছেন।

মৃত্যু অবধারিত। জন্মিলে মরিতে হইবে, ইহা এক চিরন্তন সত্য। কোন মহামারিতে মৃত্যু হলের সে মৃত্যু শহীদি মৃত্যু । আওয়ামীলীগ একটি বৃহৎ পরিবার। এই পরিবারের তিনজন নক্ষত্রের চীরবিদায়ে স্বাভাবিক ভাবে শোকাহত তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতা কর্মীরা। যেকোন মৃত্যুই অনেক কষ্টের। বিশেষ করে প্রিয়জনের কাছে, স্বজনের কাছে। এই মহামারিতে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। যারা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন তাঁদের দ্রুত সুস্থ্যতা কামনা করছি। প্রিয়জনের এই মৃত্যু শোক যেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সইতে পারেন আল্লাহর কাছে এই ফরিয়াদ করছি ।

লেখকঃ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপ কমিটির সাবেক সদস্য

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top