শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২০ ইং, ১৯ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১২ জিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » ‘বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু’

‘বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু’

মোঃ আসাদ উল্লাহ তুষার:

চিকিৎসা পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। নিজের অর্থ খরচ করে হাসপাতালে চিকিৎসা নিবে এটা যেকোন মানুষের জন্মগত অধিকার। এই অধিকার থেকে কোন ডাক্তার, হাসপাতাল বা ক্লিনিক বঞ্চিত করতে পারে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস শুরু হলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত বা এই ভাইরাসে আক্রান্ত না এমন রোগীদের সময়মতো চিকিৎসা না দিয়ে, কোন হাসপাতালে ভর্তি না করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার মত ঘটনা ইদানিং হরহামেশাই হচ্ছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক, অমানবিক।

বুকে ব্যথা নিয়ে কয়েকটি হাসপাতালে ভর্তির জন্য ছোটাছুটি করতে করতে গাড়ির মধ্যেই মারা গেছেন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের এক নেতা। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার (৯ জুন)বেলা সোয়া ১১টার দিকে অসুস্থ হয়ে পড়েন বায়েজিদ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ৫৭ বছর বয়সী শফিউল আলম ছগীর। প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মেডিকেল সেন্টার ও পার্ক ভিউ নামের আরেকটি হাসপাতালে নিয়ে গেলেও সেখানে আইসিইউ বন্ধ ও চিকিৎসক না থাকার অজুহাতে রোগীকে ফিরিয়ে দেয়া হয়।

অন্যদিকে বরিশালের একজন চিকিৎসক ‘করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে রাজধানী ঢাকার তিন হাসপাতাল ঘুরে’ মারা গেছেন। আনোয়ার হোসেন নামে এই চিকিৎসক সোমবার (৮জুন) রাত পৌনে ৩টায় ঢাকার বাড্ডা এলাকায় বেসরকারি এএমজেড হাসপাতালে আইসিইউতে নেওয়ার পর মারা যান। মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।বরিশালের বেসরকারি রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালের চেয়ারম্যান ছিলেন অর্থপেডিক সার্জন আনোয়ার।

চট্টগ্রাম নগরের পার্কভিউ, ম্যাক্স, মেট্রোপলিটন হাসপাতালে করোনাভাইরাস সন্দেহে ভর্তি নেয়নি নগর বিএনপির সহ-সভাপতি মো. কামাল উদ্দিনকে। মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি নিলেও অক্সিজেন পাননি তিনি। পরে বৃহস্পতিবার ভোর রাতে ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে মারা যান কামাল উদ্দিন। যেখানে একদম শেষ সময়ে ভর্তি করেছিল। তার করোনার উপসর্গ ছিলো।

উপরোক্ত তিনজনের দুইজন কোভিড অন্যজন নন কোভিড রোগী। শুধু এই তিনজনই নয়, এরকম প্রায় প্রতিদিনই শোনা যাচ্ছে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে চিকিৎসা নিতে না পেরে রোগী মারা যাচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকগুলি এমন নির্দয় আচরণ করছে। তদবির করে দুএকজন ভর্তি হতে পারলেও অধিকাংশ ‘সাধারণ’ রোগীকে ফিরিয়ে দিচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। করোনা রোগী শুনলেই তারা চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করছে। যারা করোনা রোগী না তাঁদেরও করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট দিয়ে ভর্তি হওয়ার কথা বলছে। ততক্ষণে রোগী বিনা চিকিৎসায় ইহলোক ত্যাগ করছেন।

করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকেই রাজধানী ঢাকা শহর সহ বিভাগীয় বা মফস্বলের বিভিন্ন শহরে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সব ধরনের চিকিৎসা প্রায় বন্ধ করে দেয়া হয়। করোনা রোগের আশঙ্কা থেকে এই চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ থাকে । পরবর্তীতে সরকারি হুঁশিয়ারি ও নির্দেশনায় হাসপাতাল ও ক্লিনিক কিছু কিছু খুললেও রোগী হয়রানির খবর হারহামেশাই পত্র পত্রিকা আসছে । দুঃখজনক হলেও সত্য সব রোগী মনে হচ্ছে করোনা রোগে মিশে যাচ্ছে। করোনা ছাড়াও যে আরো রোগ-ব্যাধি মানুষের মধ্যে আছে তা বেমালুম ভুলে যাচ্ছে এই সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। হার্টের সমস্যা, কিডনি, ডায়াবেটিসসহ নানা ধরনের বার্ধক্যজনিত রোগ, মহিলা এবং শিশুদের নানা ধরনের নন কোভিড রোগীদেরও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করছে এইসব হাসপাতাল ও ক্লিনিক । মুনাফালোভী হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মালিকেরা এই সব সাধারণ রোগীদের সাথে নির্দয় আচরণ করছে। এরা সব রোগীকেই করোনা রোগী আখ্যায়িত করে তাদের রেগুলার চেকআপ বা চিকিৎসা ব্যাহত করছে। অনেকেই মুমূর্ষ অবস্থায় হাসপাতাল হাসপাতাল ঘুরে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে। যা প্রতিদিন পত্রপত্রিকায় খবরে আসছে । আর খবর আসছে না এমন রোগীর সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে যা আমাদের গণনার মধ্যে নাই ।

করোনা ভাইরাস শুরু হওয়ার পর থেকেই ফ্রন্টলাইনার যোদ্ধা হিসেবে চিকিৎসকরা বিরাট ভূমিকা রেখে আসছে। অনেক চিকিৎসক ইতিমধ্যেই চিকিৎসা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, অনেকে ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে আবারো করোনা রোগের চিকিৎসায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। অনেকে ডাক্তার করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারাও গেছেন। যারা দেশের এই দুঃসময়ে তার পেশার প্রতি সৎ থেকে মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তারা ইতিমধ্যেই মানুষের হৃদয়ে বা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নিয়েছেন । কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সব চিকিৎসকই তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব জীবনের ঝুঁকি নিয়েও পালন করে যাচ্ছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য কিছু কিছু ডাক্তার নামধারী অসাধু ব্যবসায়ী যারা ব্যবসাকেই মুখ্য মনে করেন, তারা হাসপাতাল বা ক্লিনিকে বা কেউ কেউ ডাক্তারি পেশার বাইরে শুধুমাত্র ব্যবসায়ীক তাগিদে বেসরকারি উদ্যোগে চিকিৎসা কেন্দ্র খুলে মানুষের কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন । তারা এই দুঃসময়ে এই রোগীদের সাথে এমন নির্দয় আচরণ করছেন যা খুবই দুঃখজনক। কিছু কিছু সরকারি হাসপাতালের নামও যুক্ত হচ্ছে চিকিৎসা না দেওয়ার তালিকায়। এক্ষেত্রে সরকার যদিও বারবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন তারপরেও কেউ কেউ এ ব্যাপারে কোন কর্ণপাত করছে বলে মনে হচ্ছে না। তাদের কাছে ব্যবসা বা নিজের স্বার্থটাই মুখ্য মানুষের সেবা, মানুষকে চিকিৎসা দেয়া তাদের কাছে এখন মনে হচ্ছে বাড়তি একটি ঝামেলা ।

দেশের নামকরা বড় হাসপাতাল ইউনাইটেড হাসপাতাল ইতিমধ্যেই তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে পাঁচ জন রোগীকে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছে । তাদের গাফিলতি এবং নন চিকিৎসা সুলভ আচরণ এই পাঁচজনের প্রাণহানি হয়েছে বলে তাদের স্বজনেরা মনে করছেন। নন কোভিড রোগীদেরও তারা অস্থায়ী করোনা ইউনিটে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। ইউনাইটেড হাসপাতালের এমন অমানবিক ব্যবসায়িক আচরণ দেশের মানুষকে হতবাক করেছে। শুধু তাই নয় এইসব মৃত মানুষের পরিবারের সদস্যদের কাছে বিপুল পরিমাণ বিলের কাজও পাঠিয়েছে। এই হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবিও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা ।

করোনা কবে নাগাদ শেষ হবে তা কেউ হলফ করে বলতে পারছে না। আদৌ এই ভাইরাস সমুলে ধ্বংস হয়ে যাবে তেমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যেহেতু এই ভাইরাসের কোন ঔষধ এখনো আবিষ্কৃত হয় নাই, অনেক ক্ষেত্রে বাসায় চিকিৎসা নিয়েই অনেক মানুষ সুস্থ্য হয়েছেন, সেক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা সেবা মাথায় রেখে চিকিৎসাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনতে হবে। করোনা রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দিতে হবে, কোন অবহেলা করা চলবে না। নন কোভিড রোগীদের কোন অবস্থায়ই করোনা সার্টিফিকেট না থাকার অজুহাত দেখিয়ে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা চলবে না। যেখানে সরকার তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে, সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যখন এই অদেখা শত্রুকে মোকাবেলা করতে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সেখানে যে সব হাসপাতাল বা ক্লিনিক সেটা সরকারী বা বেসরকারি যাই হোক কোন রোগীদের চিকিৎসা দিতে অপারগতা দেখলে বা ফেরত দিলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এমন অমানবিক কাজের জন্য তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে ।

লেখক: সম্পাদক,সংসদগ্যালারীটুয়েন্টিফোরডটকম

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top