শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২০ ইং, ১৯ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১২ জিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » ‘ফিরে আসুন নাসিম ভাই’

‘ফিরে আসুন নাসিম ভাই’

মোঃ আসাদ উল্লাহ তুষার:

মোহাম্মদ নাসিম বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতির এক গতিশীল নেতৃত্বের নাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই নামের সাথে পরিচিত ১৯৮৬ সাল থেকে। তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে স্কুল ছাত্র অবস্থায় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির সেই একটু একটু হাতে খড়ির সময় থেকে মোহাম্মদ নাসিম নামের সাথে পরিচিত। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শহীদ এম মনসুর আলীর সুযোগ্য সন্তান মোহাম্মদ নাসিম তা হয়তো তখন জানতাম না। কিন্তু জানতাম যে তিনি আওয়ামী লীগের বড় নেতা, কেন্দ্রীয় নেতা, দেখতে খুব সুন্দর এবং ভালো বক্তব্য দিতে পারেন। সিরাজগঞ্জে বাড়ি আবার আওয়ামী লীগের অনেক বড় মাপের নেতা, সেই থেকে মোহাম্মদ নাসিমের নামের সাথে পরিচয়। তারপরে আস্তে আস্তে নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে আমরা,আমার যখন ছাত্র রাজনীতিতে জোরেশোরে পথচলা শুরু হয়, টুকটাক আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করি, তখন মোহাম্মদ নাসিম আমাদের কাছে বিরাট এক নেতার প্রতিচ্ছবি হয়ে আসে। তখন আস্তে আস্তে জানতে পারি তার রাজনৈতিক পরিচয় এবং পারিবারিক পরিচয়। তখনই জানতে পারি ১৯৭৫ সালের তেসরা নভেম্বর জেলখানায় নির্মম নিশংস ভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী,জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন মরণের সহচর শহীদ এম মনসুর আলীর সন্তান, আমাদের সিরাজগঞ্জের সন্তান। তারপরে সকল সংগ্রামে আন্দোলনে সিরাজগঞ্জ জেলার প্রতিটি থানায় প্রতিটা অঞ্চলে যখনই কোনো বড় জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানেই অনিবার্যভাবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকেছেন মোহাম্মদ নাসিম। তার জনসভায় দেয়া তুখোড় বক্তব্যও পরবর্তীতে আমাদের কিঞ্চিত বক্তা বানাতে ভূমিকা রেখেছে।

মোঃ নাসিম যখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক তখন থেকে আজ অবধি তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তার সংগ্রাম, কর্মীদের প্রতি ভালবাসা, দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে চলা একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ২৪ ঘন্টার ব্যস্ততা দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে সারা বাংলাদেশের মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেয়া, উল্কার মতো ছুটে বেড়ানো এবং একজন অনলবর্ষী বক্তা হিসাবে বক্তব্য দিয়ে মানুষকে আওয়ামী লীগের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করতে মোহাম্মদ নাসিমের নিরলস প্রচেষ্টা তা আমরা সেই ছাত্রজীবন থেকেই দেখে এসেছি। যদিও তার আগে তিনি আওয়ামীলীগের যুব বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে কেন্দ্রীয় রাজনীতি শুরু করেছিলেন। একসময়ে উত্তরবঙ্গের একক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সিরাজগঞ্জে নিজ দলের ছিলেন অভিভাবক।

একজন নেতা এই বাহাত্তর বছর বয়স পর্যন্ত দলের জন্য যেভাবে উল্কার মতো দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেরিয়ে জনসভা মিটিং মিছিলে অংশ নিয়ে রাজনীতি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে পারে তার সমসাময়িক একজন জ্বলন্ত উদাহরণ মোহাম্মদ নাসিম। সত্তর দশকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পাবনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তরুণ বয়সে দায়িত্ব নিয়ে সেই যে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পথ চলা শুরু হয়েছিল, আশির দশকের শুরুতে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ছায়া সঙ্গী হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে দলকে সংগঠিত করতে রাজপথে লড়াই সংগ্রামে জীবন বাজি রেখে নিপীড়ন-নির্যাতন কারানির্যাতন সহ্য করে দলকে ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আনতে দলের আরো অনেকের মতই এক বিরাট ভূমিকা রাখেন মোহাম্মদ নাসিম । আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একসময় এক অপরিহার্য নেতা হয়ে ওঠেন মোহাম্মদ নাসিম । কেন্দ্রীয় কমিটিতে যুব সম্পাদক, প্রচার সম্পাদক, একক সাংগঠনিক সম্পাদক, ওয়ার্কিং কমিটির এক নম্বর সদস্য থেকে আজ পর্যন্ত সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দলে সক্রিয় আছেন। পঞ্চম সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে সংসদে অনন্য অবদান রাখেন ।

১৯৯৬ সালে দীর্ঘ একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে প্রত্যাশিতভাবেই সরকারের মন্ত্রী রূপে প্রথমে টিএন্ডটি পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন । মোহাম্মদ নাসিম সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি যার পিতাও একসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার সন্তান হিসেবে তিনিও ওই একই চেয়ারে বসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন । পিতা শহীদ এম মনসুর আলী করেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কেবিনেটে, সন্তান মোহাম্মদ নাসিম করেছেন জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা কেবিনেটে। এ এক বিরল সৌভাগ্য বলা যায়। তারপরও রাজনীতির উত্থান পতনে দলে সব সময় একই অবস্থান ছিল না, ১৯৭৫ সালের পরে সামরিক শাসক জিয়া -এরশাদ ও খালেদার আমলে রাজপথে নিপীড়ন, কারা নির্যাতন কম ভোগ করতে হয়নি। কারাগারের যে কক্ষে পিতাকে হত্যা করা হয়েছিল সেই একই কক্ষে থাকার যন্ত্রনাও সন্তান হিসেবে সহ্য করতে হয়েছিল নাসিমকে।

২০০১ সালের নির্বাচনের পর দলের মধ্যে বেশ খারাপ অবস্থায় পড়েছিলেন মোঃ নাসিম, কিন্তু হাল ছাড়েননি, সম্মুখে থেকে লড়াই করে গেছেন, সাফল্যও পেয়েছেন। দোষে গুণেই মানুষ, আন্দোলন-সংগ্রামে দলের নেতা হিসেবে মোহাম্মদ নাসিম সারাদেশের নেতাকর্মীদের কাছে একজন শ্রদ্ধার ভালোবাসার মানুষই ছিল। হয়তো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গিয়ে মন্ত্রী রূপে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় অনেকের নানা আবদার নানা চাওয়া পাওয়ায় সায় দিতে পারেননি । প্রত্যাশা মত প্রাপ্তি সম্ভব হয়নি এই নিয়ে কিছু নেতাকর্মীদের মধ্যে হয়তো ক্ষোভ থাকতেও পারে। ক্ষোভ থাকাও স্বাভাবিক। ক্ষমতার চেয়ারে বসে সবার মন রক্ষা করা সবসময় সম্ভব হয়না, দু’দফায় ১০ বছর চারটি মন্ত্রণালয় মন্ত্রিত্ব করতে গিয়ে তিনি যেমন অনেক মানুষের অনেক ধরনের উপকার করেছেন তেমনি হয়তো অনেক মানুষ অনেক উপকারের প্রত্যাশায় গিয়ে ফিরেও এসেছেন। আমরাও কাজের জন্য গিয়েছে অনেক সময় প্রত্যাশিত কাজ হয়েছে, অনেক সময় কাজ করে দিতে পারেননি এটাই হয়তো স্বাভাবিক,সবারই প্রত্যাশা পূরণ করা সব সময় হয়ে ওঠে না । আবার একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অনেক গ্রুপিং-লবিং অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে অনেক কিছুই করতে হয়েছে যা হয়তো তার নিজ দলের কারো পক্ষে বা বিপক্ষে গিয়েছে। এমন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে মোহাম্মদ নাসিম কোন সময়ই করেন নাই বা কোন ভূমিকা রাখে নাই তা হয়তো কেউ বলতে পারবে না। আমরাও কর্মী হিসেবে টুকটাক তাঁর কাছে গিয়েছি, ব্যস্ততায় সবসময় একইভাবে সারা দিয়েছেন তা হয়তো না। হয়তো অনেকের ক্ষেত্রেই এরকম হয়েছে। ট্রাডিশনাল আঞ্চলিক ও গ্রূপিংয়ের রাজনীতিও কিছুটা ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু পাঁচ দশকের আওয়ামী লীগের রাজনীতি মোহাম্মদ নাসিমের যে অবদান তার পরিবারের, তার পিতার যে অবদান, তা কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনার পর আরো দুএকজন নেতা বাদ দিলে মোঃ নাসিমই সেই নেতা যিনি সমগ্র বাংলাদেশের আনাচে কানাচে প্রায় সব জেলা উপজেলায় দলের পক্ষে সভা সমাবেশ করেছেন। শহীদ মনসুর আলী থেকে শুরু করে তাঁর নাতি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু পরিবারের সাথেই ছিলেন এবং আছেন । বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় এবং পরে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাও এই পরিবারকে দিয়েছেন দুহাত ভরে ।

ওয়ান ইলেভেনের জরুরী সরকারের সময় গ্রেফতার হয়ে টানা দুই বছর কারাভোগের সময় সিরিয়াস স্ট্রোক করে পা সহ শরীরের এক পাশ বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে অসুস্থ শরীর নিয়েই মন্ত্রিত্ব ও রাজনীতিতে সরব ছিলেন । এই এক জীবনে মোহাম্মদ নাসিমের চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই। পিতা ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, ভাষা আন্দোলনের মহান সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি বীর সংগঠক। তিনি নিজেও ১০ বছর মন্ত্রিত্ব করেছেন চারটি মন্ত্রণালয়ের ।প্রায় তিন যুগ ধরে নিজ সংসদীয় আসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন। নিজের জীবদ্দশাতেই তার সন্তানকেও সংসদ সদস্য হিসেবে দেখেছেন । আজকে ৭২ বছর বয়সে এসে এই সময়ের বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো মরণঘাতী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পরবর্তীতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরনের কারণে অপারেশনোত্তর শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে এক সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালের বেডে নিবিড় পরিচর্যায় আছেন । তাঁর স্ত্রীও করোনায় আক্রান্ত হয়ে এখন কিছুটা সুস্থ্য । পরিবারটাই এখন বিরাট বিপদে । দেশের জন্য একাগ্রভাবে লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া, বহু নেতাকর্মীর রাজনৈতিক আইডল মোহাম্মদ নাসিম মানুষের দোয়ায় ভালোবাসায় আবার সুস্থ হয়ে রাজনৈতিক ময়দানে ফিরে আসবে এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। যেসব রাজনৈতিক দলের কর্মী এবং কিছু স্বার্থন্বেষী মানুষ এই মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটাকে নিয়ে এই সময়ে নানা ধরনের মন্তব্য বিরূপ সমালোচনা করছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই মানুষ ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে না, কিন্তু সমস্ত ভুল ত্রুটি বাদ দিয়ে যারা এ দেশের জন্য কাজ করে গেছেন বা কাজ করে যাচ্ছেন তাদের সেই কাজকেই মূল্যায়ন করা উচিত । তাদের সেই কাজই মানুষের মাঝে চির অম্লান হয়ে থাকবে ।

মোহাম্মদ নাসিম দলের জন্য এবং দেশের জন্য, তার এলাকার মানুষের জন্য যে কাজ করে গেছেন তার জন্য সারা জীবন মানুষের কাছে একজন বড় মাপের নেতা হিসাবে একজন অভিভাবক হিসেবে বেঁচে থাকবেন । তাঁর এই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মহান রব্বুল আলামীনের প্রতি আমাদের আকুল আবেদন, প্রার্থনা সৃষ্টিকর্তা যেন এই প্রিয় নেতা মোহাম্মদ নাসিম কে শেফা দান করেন। আবার দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার তৌফিক দান করেন। আমরা প্রত্যাশা করি দেশের মানুষের জন্য দেশের মানুষের কল্যাণে আবারো পার্লামেন্টে, রাজপথে সরব হয়ে মধুর কন্ঠে বক্তব্য রাখবেন । আমাদের মাঝে সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন এই প্রত্যাশা তার জেলার একজন মানুষ হিসেবে। অনেকের মতই আমাদেরও চাওয়া ফিরে আসুন নাসিম ভাই, দেশের জন্য আপনাকে আরো অনেক দিন প্রয়োজন।

লেখকঃ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপ কমিটির সাবেক সদস্য।

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top