শনিবার, ৪ জুলাই ২০২০ ইং, ২০ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৪ জিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » “সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনুন”

“সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনুন”

মোঃ আসাদউল্লাহ তুষার:

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এর কারণে সারা পৃথিবীর অর্থনীতির উপর এক বিরাট ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মাসের পর মাস কাজকর্ম বন্ধ রেখে ঘরে বসে থাকা অনেক দেশেই অর্থনৈতিক অবস্থা করুন। আক্রান্ত ২১০টি দেশে কল কারখানা, বিক্রয় বিপণন সম্পূর্ণ বন্ধ আছে। সেইসাথে অর্থনীতির চাকাও অচল হয়ে পড়েছে।বাংলাদেশও এর থেকে দূরে নয়, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো মজবুত ভিতের উপর দাঁড়ায়নি । আমাদের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ কৃষি, প্রধান রপ্তানিযোগ্য পণ্য বিশেষ করে গার্মেন্ট এবং প্রবাসীদের রেমিটেন্স সেটা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছোট বড় সব ধরণের ব্যবসায়ীই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষেরা পথে বসেছে।আগামীতে এই ক্ষতি পোষাতে হলে অনেক সময় লাগবে এতে কোন সন্দেহ নাই। ইতিমধ্যে এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন সেক্টরে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সরকার । কৃষিও এই প্রণোদনার বাইরে নয়। যদিও কৃষি ক্ষেত্রে আগে থেকেই সরকার ভর্তুকি দিয়ে আসছিল ।

যদিও জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান আগের থেকে কমে এসেছে। কিন্ত জিডিপিতে কমলেও এখনো দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কৃষিখাতের অবদান অনেক বেশি। এক সময় সোনালি আঁশ ও সোনার বাংলা একে অপরের পরিপুরক ছিল। সোনালী আঁশের সম্ভাবনাতেই বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় এখন শিল্পায়ন হচ্ছে। জিডিপিতে বাড়ছে শিল্পের অবদান। পণ্যের বহুমুখীকরণ হচ্ছে। একসময় রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ ভাগই আসতো পাট, চা ও চামড়া থেকে। এখন রফতানি আয়ের বেশিরভাগই যোগান দেয় পোশাকশিল্প। কৃষি ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। কিন্তু কৃষকের ভাগ্যের উন্নয়ন হয় নাই।

দেশে এ বছর দেড় কোটি মেট্রিক টনের মত আমন আবাদের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, আশা করা যায় উৎপাদনও হবে প্রায় কাছাকাছি। উৎপাদন বেশি হলে মিলাররা সহজে ধান কিনতে চান না। তখন সরকারকে এগিয়ে আসতে হয়। উন্নত কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগের কারণে উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। এই প্রযুক্তি সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে সব ক্ষেত্রে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে মানুষের খাদ্যের চাহিদা মিটিয়ে দেশকে সমৃদ্ধশালী করা যায়। সেক্ষেত্রে রফতানি বহুমুখীকরণেও কৃষিখাত বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু ধান নয় কৃষি ক্ষেত্রের অন্যান্য পণ্য উৎপাদনেও বিরাট অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।

করোনা ভাইরাস প্রকোপের কারণে ইতিমধ্যে কৃষি ক্ষেত্রে এবং কৃষককে নানা ধরনের প্রণোদনা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কারণ কৃষি আমাদের প্রাণ, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। জিডিপির একটি বিরাট অংশ কৃষি খাত থেকে আসলেও কৃষির প্রধান স্তম্ভ এই কৃষক সব সময় অবহেলিত। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে । কিন্তু সেই তুলনায় কৃষক তার কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায় না । বরাবর তাঁদের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয় এই প্রান্তিক কৃষক। করোনাভাইরাস পরবর্তী বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি কোন দিকে যাবে সেটা হয়তো এই মুহূর্তে আন্দাজ করা গেলেও কৃষিই যে আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং খাদ্যের যোগান দিতে বিরাট ভূমিকা রাখবে তাতে কোন সন্দেহ নাই। তাই সরকার যখন কৃষি ক্ষেত্রে সরাসরি কৃষককে নানা ধরনের প্রণোদনা দিয়ে আসছে যেভাবে, ঠিক একইভাবে চলতি মৌসুমের বিশেষ করে ধান উঠলে সরকার যখন ধান ক্রয় করবে তখন যেন সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করেন ।

যদি সরকারের কাছে নির্ধারিত মূল্যে এই কৃষকদের উৎপাদিত ধান বিক্রি করতে পারে, তবে কৃষক তখন তার ন্যায্য মূল্য পাবে। কৃষক তখন কৃষি কাজে আরো উৎসাহ পায় । কিন্তু দুঃখের বিষয় বরাবরই আমরা দেখে আসছি কৃষক তার ধানের ন্যায্যমূল্য পায়না । সরকার যে দাম ধার্য করে সেটা সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছায় না। কৃষি পণ্যের অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। উৎপাদিত স্থানে যে মূল্য থাকে তার কয়েকগুণ বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয় ক্রেতাকে। মধ্যস্বত্বভোগী কোন ফরিয়া এই দামের বেশ কিছু অংশ খেয়ে নেয় । তখন কৃষকের কৃষি পণ্য উৎপাদনের খরচই অনেক সময় উঠে আসে না। এখানে রাজনীতির নামে গড়ে ওঠা অসাধু সিন্ডিকেট সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করতে বাধা সৃষ্টি করে। যারা কৃষক না তারা সরকারের বিভিন্ন নেতৃত্ব পর্যায় যোগাযোগ করে তারাই ধান চাল কেনার অনুমতি নিয়ে নেয়। পরবর্তীতে কৃষককে ধানের ন্যায্য মূল্য না দিয়ে এক ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি করে তার প্রাপ্য মূল্যের অর্থাৎ সরকারের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্য দিয়ে এই ধান চাল ক্রয় করে থাকে। যা কৃষকের জন্য দুর্ভোগ বয়ে নিয়ে আসে, প্রকারান্তরে যা দেশের জন্য বিরাট ক্ষতি সাধিত হয়।

এক্ষেত্রে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলবো এই মৌসুমে ধানের ফলন শেষে সরকার যখন ধান চাল ক্রয় করবে তখন যেন সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে, যিনি ফসল উৎপাদন করেছেন তার কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ক্রয় করেন। কারণ যে কৃষক আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ ফসল ফলিয়ে এই অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে রেখেছে সেই কৃষককে আমাদের সর্বতোভাবে সহযোগিতা করতে হবে। কোনভাবেই মধ্যস্বত্বভোগী ফরিয়া কোন নব্য রাজনৈতিক কর্মীদের হাতে ধান চাল কেনার পারমিট দেয়া যাবে না। তাহলে সেটা হয়ে যাবে করোনা পরবর্তী অর্থনীতি জন্য একটা বিরাট ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত । সরকারকে এ ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, পাশাপাশি সরকারকে লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে যতদূর সম্ভব কৃষকের কাছ থেকে বেশি পরিমাণ ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হবে। যাতে কোনো অবস্থাতেই কৃষক তার উৎপাদিত ধান নিয়ে কোন সমস্যার মধ্যে না পড়ে, এবং তার পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায়। কৃষকের হাসি আমাদের অর্থনীতি চাঙ্গা করবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন করোনা পরিস্থিতির কারণে পৃথিবীতে অন্তত ৩৬টা দেশ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে পারে। করোনার কারণে ইতিমধ্যে সেইসব দেশের অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়েছে। এই বৈশ্বিক মহামারিতে আমাদের দেশের অর্থনীতিও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । কিন্তু কৃষি প্রধান এই বাংলাদেশ কৃষকেরা যে সোনার ফসল ফলায় তা যদি ন্যায্য মূল্য পায়, আশা করা যায় আমাদের দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হযে উদ্বৃত্ত খাদ্য অন্য দেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রাও নিয়ে আসতে পারে। যা আমাদের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। তাই সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে বিনীত অনুরোধ সরকার যেন কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য দিয়ে ধান ক্রয় করেন।

লেখকঃ রাজনৈতিক কর্মী।

 

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top